দেশান্তরঃ অবৈধ অভিবাসী, বৈধ অভিবাসী এবং শরণার্থী প্রসঙ্গেঃ প্রথম কিস্তি

২০১৪ এর লোকসভা নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পশ্চিম বাংলায় এসে শরণার্থী, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী এইসব বিষয় নিয়ে পশ্চিম বাংলার রাজনীতি বেশ গরম করে গিয়েছিলেন। এর ফলও পেয়েছেন কিছুটা। আমাদের সীমান্ত অঞ্চলে বিজেপির ভোট অনেকটাই বেড়েছে। ভারতের রাজনীতিবিদরা ‘শরণার্থী’ কিংবা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ এই বিষয়গুলো বেশিরভাগ সময়ই শুধুই ভোটের ইস্যু হিসাবেই ব্যাবহার করেছেন। আর আমারা সাধারণ মানুষও কখনই এই বিষয়টির অন্য দিকগুলো ভেবে দেখিনি। বাংলাদেশ থেকে যদি হিন্দুদের ভারতে আসার মুল উদ্দেশ্য হয় সাম্প্রদায়িক হিংসার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া তো বাংলাদেশ থেকে  মুসলিমদের ভারতে আসার এবং ভারতের জনসাধারনের সাথে মিশে যাবার মুল কারন অর্থনৈতিক। বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষেরা বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসেন শুধুমাত্র অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হবার আশায়।

আপনাদের অনেকেরই মনে আছে ২০১১ সালের প্রথম দিককার সেই বাংলাদেশী কিশোরী ফেলানীর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের কথা। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) গুলি করে ফেলানী (১৫) নামক এক বাংলাদেশি মেয়েকে হত্যা করেছিল যখন সে তার পরিবারের সাথে অবৈধ পথে ভারত থেকে বাংলাদেশে যাচ্ছিলো। গুলিতে মৃত্যুর পর তার লাশ প্রায় ৬ ঘণ্টা ভারতীয় সীমান্তের কাঁটাতারের সঙ্গে ঝুলে ছিল এবং ফেলানীর এই নির্মম হত্যাকান্ডে নিন্দার ঝড় উঠে দেশ বিদেশে। হত দরিদ্র বাংলাদেশীদের অনেকেই কাজের জন্য অবৈধ ভাবে ভারতে গমন করে যা ‘ওপেন সিক্রেট’। ফেলানীও তার বাবার সাথে দিল্লীতে অবস্থান করছিল। ফেলানীর বিয়ে ঠিক হলে সে বাবার সাথে দেশে ফিরছিল। মই বেয়ে সীমান্তের কাঁটাতার বেয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে যাবার সময় বাবা পার হয়ে গেলেও  বিএসএফ গুলিবর্ষনে ফেলানী গুলি বিদ্ধ হয়ে মারা যায়।

এরকম অবৈধ ভাবে অন্য দেশে গমন এবং অবৈধ কর্মসূত্রে সেই দেশে বসবাসের চিত্র শুধুমাত্র ভারত – বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশগুলো থেকে প্রতিনিয়ত অপেক্ষাকৃত অর্থনৈতিক দিক দিয়ে উন্নত দেশগুলোতে বৈধ বা অবৈধ ভাবে যাবার জন্য নিজ দেশ ছেড়ে যায়। আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে উচ্চ ডিগ্রিধারীরা, কম ডিগ্রিধারী মানুষেরা খুব সহজ পথ বেছে নিয়ে দক্ষিণ -পূর্ব এশিয়ার অপেক্ষাকৃত ভালো অর্থনীতির দেশগুলো, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, মধ্য প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, কানাডা, আমেরিকা এবং কখনো কখনো আফ্রিকার কিছু দেশে পাড়ি জমান।

সারা পৃথিবী জুড়ে অভিবাসনের ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে- মানুষ প্রধানত দুই কারনে অভিবাসী হয়। প্রথমত, অর্থনৈতিক এবং দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক কারণ। রাজনৈতিক কারণ হিসাবে রয়েছে কয়েকটি দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সহিংসতা। যেমন শ্রীলঙ্কা, আফগানিস্তান, ভারতের কয়েকটি রাজ্য, নেপাল, বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল, পাকিস্তানের কয়েকটি অঞ্চল, মালদ্বীপ ইত্যাদি দেশ থেকে সাধারন মানুষ রাজনৈতিক সহিংসতার কারনে অন্য দেশে আশ্রয় নেবার জন্য নিজ দেশ ছাড়ে। এইসব সাধারন মানুষেরা অন্য দেশে পাড়ি জমানোর লক্ষ্যে বৈধ অবৈধ ভাবে বিভিন্ন দেশে প্রবেশ করার চেষ্টা করে থাকে সেই সব দেশগুলোতে স্থায়িভাবে বসবাস করার লক্ষ্যে।

অর্থনৈতিক কারনঃ বৈধ প্রবেশ, অবৈধ বসবাস এবং অবৈধ কাজ

আমাদের দক্ষিণ এশিয়া থেকে অনেক সাধারন মানুষ যারা মোটামুটি শিক্ষিত তারা অপেক্ষাকৃত অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশগুলোতে গিয়ে অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হবার লক্ষ্যে শুধু মাত্র ভ্রমন ভিসা নিয়ে দেশ ছাড়েন এবং সেখানে গিয়ে তারা ভ্রমন ভিসার নিয়ম কানুন না মেনে, কোন বৈধ কাগজ পত্র ছাড়াই সেইসব দেশে লুকিয়ে লুকিয়ে বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত হন। সেইসব দেশগুলোর কিছু অসাধু লোকজনও এই ধরনের অবৈধ অভিবাসী কর্মীদের কম বেতনে তাদের বিভিন্ন কাজে নিয়োগ করে। কখনো কখনো এইসব অবৈধ অভিবাসীরা সুপার মার্কেটের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ফেলে দেয়া ফুল, ফল, সবজি ইত্যাদি রাস্তায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে বিক্রি করেন। বড় বড় হাউজিং এর পাশের ডাস্টবিন গুলো থেকে কম পুরানো জামা, জুতো, এবং অন্যান্য ফেলে দেয়া সামগ্রী সংগ্রহ করে রাস্তার পাশে বা সাপ্তাহিক বাজারে সেগুল বিক্রি করেন। কখনো কখনো তারা ট্রাফিক সিগনালে ৩০ সেকেন্ডের জন্য দাঁড়িয়ে পড়া গাড়ীর কাঁচ ধুয়ে দিয়ে প্রতি গাড়ি থেকে ২০-২৫ সেন্ট করে আয় করেন। সারা দিন শেষে হয়তো ১০-১৫ ইউরো  রোজগার করে। যেহেতু তাদের কোনও বৈধ কাগজ পত্র থাকেনা, তাই তারা পুলিশ দেখলেই দৌড়ে পালান। প্রচুর বাংলাদেশি অবৈধ অভিবাসী কর্মী এইসব কাজে নিযুক্ত থাকে। এই ধরনের অবৈধ অভিবাসী কর্মী বেশি দেখা যায় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলোতে। মধ্য প্রাচ্যের দেশ গুলোতে অবৈধ অভিবাসী কর্মীরা কম বেতনে প্রধানত নির্মাণ কর্মী হিসাবে কাজ করেন।

অর্থনৈতিক কারনঃ বৈধ প্রবেশ, মিথ্যা দাবি এবং বৈধ কাজ ও বৈধ বসবাস

কখনো কখনো অভিবাসনে ইচ্ছুক মানুষেরা বৈধ ভাবে সাধারনত ভ্রমন ভিসা নিয়ে কোন দেশে প্রবেশ করে এবং তারপর তারা তাদের পাসপোর্ট নষ্ট করে বা ফেলে দিয়ে দাবি করে যে তারা মানাব পাচারের শিকার এবং পরবর্তীতে তারা ওইসব দেশে আশ্রয় লাভের চেষ্টা করে।  কখনো কখনো তারা দাবি করে যে তারা দেশে ফেরত গেলে তাদের দেশের সরকার তাদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা মুলক আচরণ করবে তাই তারা ওইসব দেশের বিমান বন্দরে নেমেই আশ্রয় প্রার্থনা করেন।  মানবিক কারণ কখনও বা রাজনৈতিক কারণ দেখিয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করলেও তাদের মূল উদ্দেশ্য থাকে অর্থনৈতিক। তারা জানেন যে একবার যদি তারা রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়ে যান তাহলে একদিন না একদিন অবশ্যই ওইসব দেশগুলোতে পাকাপাকি ভাবে থাকার সুযোগ পাবেন। এসব করতে গিয়ে তারা অনেক সময় নিজেদের দেশের বিরুদ্ধে কখনো কখনো মিথ্যা অভিযোগ তুলে থাকেন। যেমন, ২০১২ সালে কিছু বাংলাদেশি নাগরিক যারা ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেছিল তারা ফ্রান্স সরকারের এজেন্সী ‘ফ্রেঞ্চ এজেন্সী ফর দ্যা প্রটেকশন অফ রিফিউজিস এন্ড স্টেটলেস পারসন্স (Ofpra)’ কর্তৃক বাংলাদেশকে ‘নিরাপদ দেশ’ হিসাবে গন্য করার প্রতিবাদে এক বিক্ষোভের আয়োজন করে। এই বিক্ষোভের প্রধান কারণ হল এই যে বিক্ষোভকারীরা মনে করেছিল, বাংলাদেশ নিরাপদ দেশ হিসাবে গন্য হলে যারা রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেছিল তাদের আবেদন গ্রাহ্য নাও হতে পারে! তাদের বক্তব্য ছিল যে বাংলাদেশ কোনোমতেই নিরাপদ দেশ নয়। তাই ‘নিরাপদ দেশ’ এর লিস্ট থেকে বাংলাদেশের নাম বাদ দেয়া হোক! কেউ কেউ আবার আশ্রয় প্রার্থনা করার সময় নাম, ঠিকানা ভুল বলেন। যেমন, কোন আশ্রয় প্রার্থী যদি বিহারের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও দাবি করেন যে তিনি গুজরাতের বা কাশ্মীরের বাসিন্দা এবং তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার তবে তার রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের প্রার্থনা অল্প সময়ে মঞ্জুর হবার সম্ভাবনা থাকে।

কিছু মানুষ আছেন যারা শুধুমাত্র অর্থনৈতিক সুবিধা পাবার উদ্দেশ্যেই অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশে যাবার জন্য শুরু থেকেই  মিথ্যার আশ্রয় নেন। যেমন, বাংলাদেশের নোয়াখালীর আদি বাসিন্দা যদি কোনোভাবে জার্মানিতে গিয়ে নিজেকে মায়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষ হিসাবে দাবি করেন এবং তিনি যদি মানবিক আশ্রয় লাভের আবেদন করেন তাহলেও তিনি খুব সহজেই একজন রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসাবে মানবিক আশ্রয় পেতে পারেন।

অর্থনৈতিক কারনঃ বৈধ প্রবেশ, বৈধ বসবাস ও অবৈধ কাজ 

প্রায় গত এক দশক ধরে দক্ষিণ এশিয়া থেকে আর এক রকম বৈধ অভিবাসীর সংখ্যা কয়েক গুনে বেড়েছে। এই সব অভিবাসিদের বেশিরভাগই বেশ ভালরকম শিক্ষিত। অনেকেই কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেড়িয়ে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় দেশ ত্যাগ করে। এরা পড়াশুনার নাম করে বিদেশে গিয়ে কাজ করে। বেশিরভাগ মানুষ আবার ‘শিক্ষা ভিসা’ কে কোন দেশে ‘এন্ট্রি পয়েন্ট’ হিসাবে বেছে নেন। এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা বৈধ ভাবে আংশিক সময়ে কাজ করার পরিবর্তে অবৈধ ভাবে পূর্ণ সময়ে কাজ করেন। তাদেরও মূল উদ্দেশ্য বিদেশের মাটিতে টাকা রোজগার করা। লন্ডন শহরের অক্সফোর্ড স্ট্রিট এ প্রচুর অল্প বয়সী অভিবাসী রিক্সাওয়ালা দেখতে পাওয়া যায়। যারা পড়াশুনা করতে এসে পড়াশুনা না করেই টাকা রোজগারের দিকে ঝুকে পরে। কখনো এই সব অভিবাসিরা ব্রিটেনের মাটিতে পা দিয়েই কোন একটা কাজ যোগার করেই সরাসরি কর্মস্থলে চলে যায়। যারা পড়াশুনা করার ভিসা নিয়ে বিভিন্ন দেশে যান, তারা বেশিরভাগ দেশেই সাধারনত সপ্তাহে আইনত ২০ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন। কিন্তু বিভিন্ন দেশের অভিবাসী আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে তারা ৪০ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় ধরে কাজ করেন। তারা প্রায়ই সরকার নির্ধারিত বেতনের চেয়ে অনেক কম বেতনে কাজ করে থাকেন এবং তাদের পারিশ্রমিক ব্যাংকে না জমা করে সরাসরি নগদ টাকায় নিয়ে থাকেন। এর ফলে কোন ব্যাক্তি যদি আইনের ফাক গলে বেঁধে দেয়া সময়ের বেশি কাজ করেও থাকেন তবেও তার কোন প্রমাণ সেইসব দেশের সরকারের কাছে থাকেনা। এর ফলে ওইসব দেশ গুলোর রাজস্ব আদায়ের পরিমাণও কম হয়। ২০০৮-২০০৯ সাল থেকে এই ধরনের ছাত্র-ভিসায় দক্ষিণ এশিয়ার প্রচুর সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী এবং ‘বয়স্ক’ ছাত্র-ছাত্রী বিভিন্ন দেশে গিয়ে অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হবার চেষ্টা করেছেন।

আর অন্য একটি ভয়ঙ্কর এবং অমানবিক পেশায় জড়িয়ে পড়ে অভিবাসী কিছু নারী। দক্ষিণ এশিয়া থেকে এক উল্লেখযোগ্য সংখক নারী ‘মানব-পাচার’ এর শিকার হয়ে অর্থনৈতিক ভাবে উন্নত দেশগুলোতে গিয়ে যৌন পেশায় জড়িয়ে পড়ে। এইসব নারীদের বেশিরভাগ সময়ই দালাল বা আড়কাঠিরা নিকট আত্মীয় পরিচয় দিয়ে উন্নত দেশগুলোতে নিয়ে যায় এবং যাবার পর তাদের বাধ্য করে যৌন পেশায় জড়িয়ে পড়তে। বেশিরভাগক্ষেত্রে অভিবাসী শ্রমিকরাই এদের খদ্দের। অনেক সময় যৌনকর্মীরা নিজেরাই ভ্রমন ভিসা নিয়ে কোন দেশে প্রবেশ করে যৌন পেশায় নিয়োজিত হয়। ভিসার মেয়াদ শেষ হলে ফিরে এসে আবার নতুন করে ভ্রমন ভিসা নিয়ে সেই দেশগুলোতে ফিরে যায়।

অর্থনৈতিক কারনঃ বৈধ অভিবাসী শ্রমিক ও তাদের দুর্দশা

দক্ষিণ এশিয়ায় প্রায় সব দেশেরই বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হল অভিবাসী শ্রমিকদের পাঠানো টাকা। যেমন, ২০১২ সালে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থের পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের খাতের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছিল। দিন দিন এই অভিবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থের পরিমান বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল এইসব দেশ থেকে প্রধানত আধা দক্ষ, অদক্ষ শ্রমিক, গৃহপরিচারিকা অথবা ড্রাইভার হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গিয়ে থাকেন। তা ছাড়া রয়েছে দক্ষ বা পেশাদারী প্রবাসী। অবশ্য ভারত বাদে অন্য দেশগুলো থেকে দক্ষ বা পেশাদারীদের সংখ্যা তুলনামুলক ভাবে কম।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার নিজে থেকেই শ্রমিক পাঠানোর ব্যাবস্থা করলেও রয়েছে বেশ কিছু বেসরকারি এজেন্সি। বৈধ ভাবে অভিবাসী শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রধান লক্ষণীয় বিষয় হল এই যে,  গৃহপরিচারিকা পাঠানোর ক্ষেত্রে খরচ খুবই কম। গৃহপরিচারিকা হিসাবে বাংলাদেশি নারীরা মাত্র ১০ হাজার টাকা খরচ করে লেবানন যেতে পারেন, ১৭ হাজার টাকা খরচ করে সৌদি আরব যেতে পারেন। অন্য দিকে পুরুষ শ্রমিক পাঠানোর খরচ বেশ কয়েকগুন বেশি। নারী – পুরুষ দুই ধরনের শ্রমিকরাই বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হন। তবে নারী অভিবাসী শ্রমিকদের বেশিরভাগই যেহেতু গৃহপরিচারিকা হিসাবে কাজ করেন তাই তাদের উপর যৌন নির্যাতনসহ অন্যান্য শারীরিক নির্যাতন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

মায়ানমার এবং কম্বোডিয়া থেকে প্রচুর সংখ্যক মানুষ অপেক্ষাকৃত ভালো কাজের আশায় দেশ ত্যাগ করে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে যায়। কখনো কখনো এইসব গরীব অভিবাসী শ্রমিকদের ভালো কাজের নাম করে দিনের পর দিন থাইল্যান্ডের জলসীমায় মাছ ধরার নৌকোতে আটকে রাখা হয়। তাদের দিয়ে দৈনিক ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করানো হয়। তাদের নিয়মিত মারধর করা, তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক আটকে রাখা, এমনকি তাদের হত্যাও করা হয়। এই সব অভিবাসী শ্রমিকরা যেসব ‘সী ফুড’ তৈরি করে তা আমেরিকা, ব্রিটেন এবং ইউরোপ এর বিভিন্ন সুপার মার্কেটে অনেক বেশি দামে বিক্রি হয়! এই সিরিজের পরবর্তী কোন একটা পর্বে অভিবাসী শ্রমিকদের উপরে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন এর বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

অর্থনৈতিক কারনঃ বিপদ শঙ্কুল যাত্রা, অবৈধ প্রবেশ, অবৈধ বসবাস ও অবৈধ কাজ

দক্ষিণ এশিয়া থেকে প্রচুর সংখ্যক মানুষ নৌকায় করে পাড়ি দেয় দেশান্তরি হবার লক্ষ্যে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানব পাচারকারীরা মাছ ধরার নৌকায় করে পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা এইসব দেশ থেকে মানুষদের পাচার করে থাকে। এইসব মানুষদের প্রথম গন্তব্যস্থল হল মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলো। সেখান থেকে আবার অন্যান্য দেশে পাড়ি জমায়। যেসব মানুষ অস্ট্রেলিয়া যাবার জন্য নৌকায় পাড়ি দেয় তাদের বেশির ভাগই মানুষই অস্ট্রেলিয়ার জলসীমায় ধরা পরলেও তারা অস্ট্রেলিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করে। এভাবে অস্ট্রেলিয়ায় প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২০ হাজার সাগর পাড়ি দেয়া অবৈধ অভিবাসী রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করে। যেহেতু অর্থনৈতিক ভাবে উন্নত প্রায় সব দেশে অবৈধ অভিবাসীদের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়া সহজ তাই গত কয়েক বছরে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনার হার ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার অন্যদিকে বিভিন্ন সরকার অভিবাসন ব্যবস্থা কঠোর করেছে। অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ মাসখানেক আগেই শ্রীলঙ্কা থেকে আগত ৩০০ জনের মত রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থীদের আবার সমুদ্র পথেই ফেরত পাঠিয়েছে। বছর খানেক আগে অস্ট্রেলিয়া সরকার পাপুয়া নিউ গিনিতে বেশ কিছু  আশ্রয় কেন্দ্র খুলেছে অবৈধ অভিবাসীদের জন্য। এই আশ্রয় কেন্দ্র অনেকটাই জেলখানার মত। যখন কোন  অভিবাসীর আশ্রয় প্রার্থনা মঞ্জুর করা হয় তখনই শুধু তাকে  অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে নিয়ে আসা হয়। আর যখন কোন অভিবাসীর আশ্রয় প্রার্থনা মঞ্জুর না হলে তাকে তার দেশে ফেরত পাঠানো হয়। জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশ থেকে সাগরপথে অবৈধভাবে তিন শতাধিক যাত্রী নিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হওয়া একটি যন্ত্রচালিত নৌকাতে ব্যাপক সংঘর্ষ ও গুলি চালানোর ঘটনায় অবৈধ যাত্রীদের পাঁচজন নিহত এবং ৪০ জন আহত হন। জানা গিয়েছে যে, অবৈধভাবে বিদেশে নিয়ে চলা দালালরাই সংঘর্ষের একপর্যায়ে যাত্রীদের ওপর গুলি চালায়। অবৈধ অভিবাসনের ক্ষেত্রে সবসময়ই একটি আন্তর্জাতিক দালাল চক্র কাজ করে। এইসব দালালেরা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে গরীব মানুষদের প্রলোভন দেখিয়ে অবৈধ বিদেশ যাত্রায় উদ্বুদ্ধ করে। আর এই গরীব মানুষেরা মাসের পর মাস ধরে অর্ধাহারী বা অনাহারী অবস্থায় থেকেও সাগর, পাহাড়, মারুভুমি পাড়ি দেয়। কখনো কখনো সঙ্গী যাত্রীদের মৃত্যু হলে তাদের মাংস খেয়েও জীবন বাঁচিয়ে রেখে এগিয়ে চলে ‘স্বপ্নের দেশে’ যাবে বলে।

অন্য দিকে বিভিন্ন দেশের সরকারও মানুষের অবৈধ প্রবেশ এর ঠেকাতে ভিসা প্রাপ্তির জন্য কঠোর নিয়ম-কানুন করেছে,  তাদের সীমান্ত প্রহরা বাড়িয়েছে এবং অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তির সয়াহতা নিচ্ছে। এতসবের পরেও অর্থনৈতিক ভাবে উন্নত দেশগুলোর অভিবাসন কর্তৃপক্ষ  কিন্তু  অনুন্নত দেশ থেকে অবৈধভাবে মানুষ আসার সংখ্যা কমাতে পারছে না।

তাই মূল প্রশ্ন এখন, কেন উন্নত দেশের সরকারগুলো অপেক্ষাকৃত অনুন্নত দেশগুলো থেকে অবৈধভাবে মানুষ আসার সংখ্যা কমাতে পারছে না? অবৈধ অভিবাসনের জন্য কারা দায়ী? দায়টা কি সেই মানুষগুলোর যারা একটু ‘ভালো’ থাকার স্বপ্ন দেখে? নাকি আমাদের সরকারগুলোর, যারা তাদের জনগণকে একটা কর্মসংস্থানের ব্যাবস্থা করে নিশ্চিন্ত জীবন-যাপনের বন্দোবস্ত করে দিতে পারছেন না?

This entry was posted in Activism. Bookmark the permalink.

One Response to দেশান্তরঃ অবৈধ অভিবাসী, বৈধ অভিবাসী এবং শরণার্থী প্রসঙ্গেঃ প্রথম কিস্তি

  1. Pingback: দেশান্তরঃ অবৈধ অভিবাসী, বৈধ অভিবাসী এবং শরণার্থী প্রসঙ্গে | Let’s talk about Tech & Human Rights

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s