‘গণ-উৎস’ পদ্ধতি এবং গণতান্ত্রিক জন-প্রশাসন

 

‘গণ-উৎস’- একটি নতুন শব্দ যুগল বলে মনে হলেও বিষয়টি কিন্তু নতুন নয় একেবারেই। প্রথমেই জেনে নেয়া যাক, বর্তমান বিশ্বে বহুল প্রচলিত ‘গণ-উৎস’ পদ্ধতিটি আসলে কি? ২০০৬ সালে জেফ হোউ নামে একজন বিশেষ কলমলেখক ‘দি রাইজ অফ ক্রাউডসোর্সিং’ নামক প্রবন্ধে সর্বপ্রথম ‘ক্রাউডসোর্সিং’ বা বাংলায় ‘গণ-উৎস’ শব্দটি ব্যবহার করেন। সহজভাবে বলতে গেলে ‘গণ-উৎস’ পদ্ধতি হল ‘আউটসোর্সিং’ এর একটি ধারা যেখানে শুধু বিশেষজ্ঞরাই নন, সাধারণ মানুষও কোন একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য পুরনের জন্য বিভিন্ন কাজে স্বেছায় নিয়োজিত হন। আর এই নির্দিষ্ট লক্ষ্যটি হতে পারে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কিংবা হতে পারে দুর্যোগ ব্যাবস্থাপনায় সহায়তার কাজ। বেশীরভাগ সময়ই এই কাজে যারা নিয়োজিত হন, তারা কোন একটা সমস্যার সমাধানে নিজেদের দায়িত্ববোধ থেকেই এই কাজে অংশগ্রহন করেন। ‘গণ-উৎস’ পদ্ধতির আর একটি প্রধান চরিত্র হল এই পদ্ধতি বর্তমান তথ্য ও টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যাবহার ছাড়া অচল।

এবারে দেখে নেয়া যাক, এই ‘গণ-উৎস’ পদ্ধতি কিভাবে গণতান্ত্রিকভাবে জন-প্রশাসনিক কাজে ভুমিকা রাখতে পারে।

২০১১ সালের জুলাই মাসে ২৫ জন সাধারণ মানুষ আইসল্যান্ডের সংবিধানের একটি খসড়া সংসদে উপস্থাপন করেন। আপনার, আমার মত সাধারণ নাগরিক, ছাত্র, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সমাজকর্মী এরা সবাই মিলে প্রাথমিক খসড়াটি তৈরি করেছিলেন। এই খসড়াটি প্রথমে অনলাইনে পোস্ট করা হয় এবং সাধারণ জনগণের কাছ থেকে ওয়েবসাইট এবং ফেসবুকের মাধ্যমে এই খসড়া সংবিধান সম্পর্কে মতামত চাওয়া হয়। শুধু আইসল্যান্ডই নয়, আমরা এও দেখেছি যে ‘আরব বসন্তে’র সময় আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ছাত্র, শিক্ষক, স্বেছাসেবক মিলে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করেছিলেন এবং মিশরের প্রস্তাবিত নতুন সংবিধান কেমন হতে পারে সে বিষয়ে জনসাধারনের মতামত চাওয়া হয়েছিল। এমনকি আমরা আমাদের দেশেই দেখেছি এর ব্যবহার। ২০১২ সালের নির্ভয়া কান্ডের পর বিচারপতি ভার্মা কমিটি ৮০,০০০ এর বেশি ভারতীয়র কাছে থেকে পরামর্শ পেয়েছিলেন যে কিভাবে ফৌজদারি আইনের সংশোধনী করে নারীর প্রতি চরম প্রকৃতির যৌন নির্যাতন সংগঠনের অপরাধীদের জন্য দ্রুত বিচার ও শাস্তি প্রদান করা যায়। আবার আম আদমি পার্টি দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনের সময় ভারত এবং বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজার হাজার ভারতীয়দের স্বেছাসেবক হিসাবে জড়ো করতে পেরেছিল এই ‘গণ-উৎস’ পদ্ধতি প্রয়োগ করেই।

যদিও আধুনিক তথ্য ও টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তি নির্ভর ‘গণ-উৎস’ পদ্ধতির ব্যবহার সর্বপ্রথম হয়েছে ২০০৮ সালে। কেনিয়ার সাধারণ নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতাকে সনাক্ত করনের কাজে প্রথমবারের মত প্রশাসনিক কাজে আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভর ‘গণ-উৎস’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। ২০০৭ সালের সাধারণ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় ‘উশাহিদি’ নামক একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়। ‘উশাহিদি’ শব্দটি আফ্রিকার সোয়াহিলি শব্দ যার বাংলা অর্থ হল সাক্ষী বা প্রত্যক্ষদর্শী ব্যক্তি। সেই সময়ে ‘উশাহিদি’র তরফে একটি মোবাইল নম্বর দিয়ে বলা হয়েছিলো যে, যদি কেউ কোন সহিংসতার প্রত্যক্ষদর্শী হন অথবা কোন সহিংসতার তথ্য জানেন তবে যেন সেই নির্দিষ্ট মোবাইলে এসএমএস করে জানানো হয়। এছাড়া, সেই নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে গিয়ে অথবা একটি টুইট পাঠিয়েও কোন সহিংসতার ঘটনা লিপিবদ্ধ করার সুযোগ ছিল। কিন্তু বেশীরভাগ মানুষ এসএমএস পাঠিয়েই নির্বাচন–পরবর্তী সহিংসতার ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছিলেন। এই ঘটনাগুলো এসএমএস বা টুইট পাঠিয়ে জানিয়ে দেবার পর ‘উশাহিদি’র পক্ষ থেকে একজন ঘটনাগুলো প্রাথমিকভাবে যাচাই করে তথ্য গুলো ওয়েবসাইটে সরাসরি যুক্ত করে দিত। এই ওয়েবসাইট গুলো সাধারণত ‘সংকট মানচিত্র’ বা ইংরেজিতে ‘Crisis Map’ হিসাবে পরিচিত। কেনিয়ার সাধারণ জনগণ নিজেরাই দায়িত্ব নিয়েছিলেন নির্বাচন–পরবর্তী সহিংসতা কমানোর। আর এর ফলে সুফলও পাওয়া গিয়েছিল সাথে সাথেই। সহিংসতার ঘটনাগুলোর সত্যতা যাচাই করার পর আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছিলো এবং এর ফলে পূর্ববর্তী সাধারণ নির্বাচনের চেয়ে হানাহানি ও মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কম হয়েছিলো।

kenya

কেনিয়ার নির্বাচন–পরবর্তী প্রথম সংকট মানচিত্র (Crisis Map)(সুত্রঃ উশাহিদি)

পরবর্তীকালে প্রায় প্রতিটি বড় দুর্যোগ মোকাবেলায় এই সংকট মানচিত্র এবং ‘গণ-উৎস’ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। সর্বশেষ উদাহরণ হল, নেপালের সাম্প্রতিক ভুমিকম্পের পর রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবিক বিষয়ক কর্মকাণ্ড সমন্বয়কারী অফিসের তত্বাবধানে সারা পৃথিবী থেকে ২৮০০ এর বেশি স্বেচ্ছাসেবক ভুমিকম্প-পরবর্তী কালীন সময়ে  উদ্ধার কাজে সহায়তার জন্য যোগদান করা। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বসে এইসব স্বেচ্ছাসেবকেরা কখনো হয়তো কোন ধ্বংসের ছবি দেখে বোঝার চেষ্টা করেছেন ধ্বংসের গভীরতা, কখনো বা ভুমিকম্পের শিকার দুর্গত নেপালী জনগণের নেপালী ভাষায় পাঠানো তথ্য বা উপাত্ত ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন বা ইংরেজী তথ্য নেপালী ভাষায় অনুবাদ করেছেন। এর ফলে উদ্ধারকারীদের কাজ করতে অনেক সুবিধা হয়েছে। তারা উদ্ধার কাজ শুরু করার আগেই দুর্গম এলাকার সত্যিকারের চিত্রটা কি তা বুঝে নিতে পেরেছিলেন।

বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘গণ-উৎস’ পদ্ধতির ব্যবহার- সে দুর্যোগ ব্যাবস্থাপনা হোক আর কোন সরকারি সিদ্ধান্তে মানুষের মতামত গ্রহণই হোক না কেন, এটি শুধু বিভিন্ন তথ্য ও উপাত্ত একত্রীকরণ বা শ্রেণীভুক্তকরণ করেনা, এটি কোন একটি বিশেষ অবস্থার সময় নির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিতে এবং কখনো কখনো উদ্ধারকার্যের জন্য নির্দিষ্ট প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করে। ‘গণ-উৎস’র উদ্যোক্তারা কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তি ও সম্প্রদায় সম্পর্কিত বা তাদের থেকে তথ্য জড়ো করতে বা দুর্যোগ প্রবণ এলাকার চিহ্নিত করতে বা কাউকে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরিত করতে নির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ যেমন শিল্প, ব্যবসা, রাজনৈতিক, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, সরকার, স্বাস্থ্য সেবা, সফটওয়্যার তৈরি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ সম্পর্কিত বিভিন্ন উদ্যোগে অংশ নিতে পারেন। তবে পর্যালোচনা করে দেখা গিয়েছে যে, এই পদ্ধতি সাফল্যের সাথে সরকারের জন-প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার কাজে অভূতপূর্ব ভাবে সাহায্য করতে পারে। সাধারণ নাগরিক বা সাধারণ নাগরিকদের সংগঠন বা কোন সরকারী দপ্তর খুব সহজেই এই ধরনের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারেন। এই প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে তারা কোন সামাজিক সংকট, স্বাস্থ্য সমস্যা, যোগাযোগ সমস্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কোন অঞ্চলের রাজনৈতিক সংঘাত- ইত্যাদি সম্পর্কিত তথ্য তৃণমূল স্তর থেকে পেতে পারেন এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহন করতে পারেন।

পশ্চিমবঙ্গ তথা সারা ভারতবর্ষে এই পদ্ধতি সফলভাবে কার্যকর করার পথ তৈরি করে দিয়েছে আমাদের দেশের মোবাইল ফোনের ব্যবহার। আগামি তিন থেকে চার বছরের মধ্যে ভারতের প্রায় সব প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের হাতে স্মার্টফোন থাকবে বলে মনে করা হয়। ২০১৪ সালে আগের বছরের তুলনায় ভারতে স্মার্টফোন দিয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করা বেড়েছে ৫৫ শতাংশ। এভাবে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য, উপাত্ত সঠিক ভাবে বিশ্লেষণ করে জন-প্রশাসনিক কাজকর্ম বিশুদ্ধ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সাফল্যের সাথে করা সম্ভব।

ধরা যাক, কলকাতা পুরসভার কোন একটি ওয়ার্ডের কোন একটি রাস্তায় কোন নির্দিষ্ট স্থানে ম্যানহোলের ঢাকনা নেই। এখন যদি কলকাতা পুরসভার একটি অনলাইন প্লাটফর্ম থাকতো এবং সেখানে এই ব্যবস্থা থাকতো যে, একজন সাধারণ মানুষ যে কোন ধরনের সমস্যা সরাসরি তার কাউন্সিলরকে জানাতে পারবেন বা সরাসরি সেই কাজের দায়িত্বে থাকা আধিকারিককে জানাতে পারবেন, তাহলে যে কেউ তার স্মার্টফোনের সাহায্যে একটি ছবি তুলে, ছবি তোলার সময় ও তারিখ সহ জায়গাটির সঠিক ভৌগলিক অবস্থান (যেটা জিপিআরএস / জিপিএস এর মাধ্যমে সহজেই জানা সম্ভব) দিয়ে একটি রিপোর্ট পাঠাতে পারেন। আর অফিসে বসে থাকা আধিকারিক মুহূর্তের মধ্যেই এই সমস্যাটার কথা জানতে পেরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন।

আবার ধরা যাক, পশ্চিম বাংলার স্বাস্থ্য দপ্তর প্রতিটি প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের কাজকর্ম- যেমন ডাক্তার বা নার্সদের উপস্থিতি, কখন এবং কতক্ষণ তারা স্বাস্থ্য কেন্দ্রর উপস্থিত থাকেন তা পর্যবেক্ষণ করতে চাইছে। সেক্ষেত্রে একটি মোবাইল নির্ভর ‘গণ-উৎস’ এপ্লিকেশন ব্যবহার করা যেতে পারে। এই এপ্লিকেশনটি নিয়মিত বিরতিতে তথ্য পাঠাতে থাকবে এবং স্বাস্থ্য দপ্তর এর তথ্য ভাণ্ডারে তা জমা হতে থাকবে। আর এই জমা হওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করেই স্বাস্থ্য দপ্তরের আধিকারিকগণ বুঝে যাবেন যে কোন নির্দিষ্ট ডাক্তার বা নার্স কতক্ষণ রোগীদের সেবায় নিয়োজিত থাকেন। একই ধরনের এপ্লিকেশন ব্যবহার করা যেতে পারে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাজকর্ম পর্যবেক্ষণ করার জন্যও।

আবার ধরুন, কোন একটি রাস্তা সম্প্রসারনের বিষয় নিয়ে জনগনের মতামত জানা দরকার। সেক্ষেত্রে আপনি প্রাথমিক পরিকল্পনাটি ওয়েবসাইটে দিয়ে জনগনের কাছ থেকে এই বিষয়ে কি প্রতিক্রিয়া তা সংগ্রহ করতে পারেন এবং পরবর্তী কালে সেই মতামত অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারেন।

যে কোন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষের মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যা একটি বিশুদ্ধ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অঙ্গও বটে। কিন্তু বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে, প্রচলিত পদ্ধতিতে যে কোন প্রশাসনের পক্ষেই প্রতিটি সরকারি সিদ্ধান্তর বিষয়ে জনগণের মতামত সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব বেশ কিছু কারণে। কিন্তু তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার করে খুব সহজেই প্রশাসন জনগনের কাছাকাছি চলে আসতে পারে। যে কোন প্রশাসনিক ব্যবস্থায় জনগণের অংশগ্রহন নিশ্চিত করতে পারলে প্রশাসনের কাজ অনেক সহজ এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে করা সম্ভব হয়।  আর তখন জনগণও অনুধাবন করতে পারে যে তারাও বিভিন্ন সরকারি কর্মকাণ্ডের সরাসরি অংশীদার।

 

This entry was posted in Activism. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s