বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি একজন অপরিচিত ভারতীয়র কাছে গুরুত্বপূর্ণ কেন?

ফেসবুকে আমার কিছু বাংলাদেশী বন্ধু আমাকে উপদেশ দেয় বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো ব্যাপারে কোনো কথা না বলতে। আমি আগে তাদেরকে বলতাম যে যেহেতু আমি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বাংলা অনলাইন কমিউনিটি নিয়ে যেহেতু কাজ করি তাই কাজের খাতিরে আমাকে নাক গলাতেই হয়! আমি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল-এ কাজ ছেড়ে দিয়েছি প্রায় দু বছর আগে কিন্তু এখনো সেই একই কাজ করি।  আমার সহপাঠীরা- যাদের সাথে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি আমার স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পাঠ শেষ করেছি, তারা জানতে চায় কেন আমি বাংলাদেশ সম্পর্কিত পোস্ট বেশি দেই আমার ফেসবুক প্রফাইলে! এদের কাউকে না কাউকে এখনো কোনো না কোনো ‘ক্লারিফিকেশন’ দিতেই হয়।

তবুও নিয়মিত বাংলাদেশী খবরের কাগজ গুলো পড়ি। বেশ আগ্রহ এবং উত্কন্ঠা নিয়েই খোঁজ রাখি আমার বাড়ি থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরত্বের দেশটির সর্বশেষ অবস্থা জানার জন্য। কিন্তু কি কারণে আমার এই উত্কন্ঠা বাংলাদেশকে নিয়ে? কিংবা ওই দেশের মানুষদের নিয়ে? এই উত্কন্ঠার প্রথম এবং প্রধান কারণ, বাংলাদেশে অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরী হলে তার নেতিবাচক প্রভাব ভারতের উপর, বিশেষ করে পশ্চিম বাংলার উপর পড়বে। ভারতের একজন ‘আম আদমি’ কিন্তু দায়িত্বশীল নাগরিক হিসাবে দেশকে যেকোনো নেতিবাচক প্রভাব এর হাত থেকে রক্ষা করা আমার দায়িত্বর মধ্যে পড়ে  বলে মনে করি। বাংলাদেশ সংখ্যালঘুদের অধিকার যেভাবে হরণ করা হচ্ছে, যেভাবে প্রতিনিয়ত ভয়-ভীতি দেখিয়ে তাদেরকে দেশ ছাড়া করা হচ্ছে তাতে বাংলাদেশের হিন্দু সংখ্যালঘুর সংখ্যা ১ শতাংশের নিচে নেমে আসতে আর বেশি হলে মাত্র ৬০-৭০ বছর লাগবে। একজন বাঙালি হিসাবে, এটা ভাবতে কষ্ট লাগছে যে, পৃথিবীর অন্যতম উদার সংস্কৃতির পীঠস্থান থেকেই, সেই সংস্কৃতির কিছু ধারক ও বাহকদের, ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে দেশান্তরী হতে হচ্ছে। মানবাধিকারের কোনো আন্তর্জাতিক সীমারেখা নেই।  অমরদের পশ্চিম বাংলার বুদ্ধিজীবিগণ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মিছিল করেন। ইরাক, আফগানিস্থানে বোমা হামলার প্রতিবাদের লাখ মানুষের সমাগম ঘটায়। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশ ঘটিয়ে লম্বা লম্বা ভাষণ দেন। সারা পৃথিবী জুড়ে শান্তির বাণী ওড়ান। কিন্তু বাংলাদেশের সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলেননা কখনো। মানবাধিকার কর্মী হিসাবে আমরা যেমন ভারতে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলি, তেমন ভাবেই  বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের অধিকার লংঘনের বিরুদ্ধে কথা না বললে বড় অন্যায় হবে বলে মনে করি।

বাংলাদেশে এবং বিশেষ করে অস্থিতিশীল বাংলাদেশে সবচেয়ে সমস্যার মধ্যে থাকেন প্রান্তিক, ধর্মীয় এবং জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষজন। আগামী তিন মাসের মধ্যেই বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচন হবার সম্ভাবনা। বর্তমানে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে। নিয়ম করেই হিন্দু সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতন শুরু হয়েছে। নির্বাচন-পূর্ববর্তী সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর এই হামলা কি কোনো অন্য কিছুর আভাস? গত এক মাসের মধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে যখন নয়-নয়টি সাম্প্রদায়িক হামলা হয়, তখন স্বাভাবিক ভাবেই অনুমান করা যায় ভবিষ্যতে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নিতে পারে। এইরকম একটা সম্ভাব্য অস্থিতিশীল পরিবেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠির, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটা বড় অংশ সীমানা পার হয়ে ভারতবর্ষে আশ্রয় নেবে এটা ধরে নেয়া যায়। এই ধরনের আশ্রয় নেয়াকে আমরা ‘অনুপ্রবেশ’ বলে চিহ্নিত করে থাকি, কারণ ভারতবর্ষ এই ধরনের আশ্রয় নেয়া জনগোষ্ঠিকে এখনো শরণার্থী হিসাবে চিহ্নিত করে না। এই ধরনের নিয়মিত ‘অনুপ্রবেশে’র ফলে ভারতীয় অর্থনীতিতে যে চাপ পড়ছে সেটাকে কোনভাবেই অবহেলা উপায় নেই। যদি জানতে চান এই অনুপ্রবেশের ধরন / পরিমান কেমন? সেটা দেখতে চাইলে আপনাদের চলে যেতে হবে ভারতের দিকের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত অঞ্চলে। আপনারা দেখতে পাবেন যে, গ্রামের পর গ্রাম ভরে গেছে বাংলাদেশী হিন্দু সংখ্যালঘুদের ভিড়ে। এমন কিছু পাড়া বা মহল্লা আছে যেখানের শতভাগ মানুষই বর্তমান  বাংলাদেশ থেকে আগত। বলাই বাহুল্য যে এইসব বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু ‘অনুপ্রবেশকারী’রা বাংলাদেশে ফিরে যাবেন বলে ভারতে আসেন না। তারা হয় একটু জমি কিনে বা অথবা রেললাইনের ধরে ঝুপড়িতে বসবাস করেন। বনগাঁ থেকে শিয়ালদহ রেল লাইনের প্রতিটি স্টেশন এর ধারে ঝুপড়িবাসীদের বেশিরভাগ মানুষই ভারতীয় আইনের ভাষায় বাংলাদেশী ‘অনুপ্রবেশকারী’। অন্যদিকে ভারতের রাজনৈতিক দল বিজেপির ‘আন-অফিসিয়াল রেকর্ডে’  এরা শরণার্থী।

যাই হোক, স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে যে এই অনুপ্রবেশের কারণ কি তাহলে? বাংলাদেশ তো স্বাধীন হয়েছে সেই ১৯৭১ সালে। গঠিত হয়েছিল একটি ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র। কেন বাংলাদেশের হিন্দুরা ভারতে এসে আশ্রয় নিচ্ছেন? আমি যখন এই লেখাটি লিখছি ঠিক তখনই ফেসবুকে চোখ বুলাতে গিয়ে বাংলাদেশের ইত্তেফাক পত্রিকার একটা খবর দেখলাম এই রকম:

‘সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার বালাবাড়ি গ্রামের ২০টি হিন্দু বাড়ির দরজার সামনে মরা গরুর মাথা ও হাঁড়-গোড় ফেলে গেছে দুর্বৃত্তরা। একই সময় গ্রামের মন্দিরের চুলা ভাংচুর করে সেখানেও গরুর মাথা ও হাঁড়-গোড় ফেলেছে তারা। এতে গ্রামটির হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আতংক বিরাজ করছে।…….এলাকাবাসী ও পুলিশ জানায়, ওই গ্রামের সূত্রধর পাড়ার প্রভাত, সুশান্ত, সুভাষ, শ্যামলাল, গোপাল, লঙ্কেশ্বর, প্রেমলাল, পরিতোষ, ভীম, অর্জুন, উজ্জল সূত্রধরসহ ২০টি পরিবারের সদস্যরা সোমবার ঘুম থেকে উঠে বাড়ির দরজায় গরুর মাথা ও হাঁড়-গোড় দেখে থানায় খবর দেয়। ….সুশান্ত, প্রভাত ও গোপাল সুত্রধর জানান, সকালে ঘুম থেকে উঠে জিনিসগুলো দেখে সবাই হতবাক ও আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এরপর থেকে আর কারো নাওয়া-খাওয়া নেই। তারা জানান, আমাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনে এলাকা ছাড়া করার পাঁয়তারা করছে জামায়াতের লোকজন।….’- ইত্তেফাক, অনলাইন সংস্করণ, ১৯ নভেম্বর, ২০১৩।  খবরের  লিংক 

এই তো গেল এখনকার সময়ের একটি উদাহরণ। আমার জানা মতে,  (খবরের কাগজের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী) গত এক মাসে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের উপর ৯ টি  হামলার ঘটনা ঘটেছে। অতীতে কিংবা নিকট অতীতে কি হয়েছে? অতীতের বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ না দিয়ে একটা পরিসংখ্যান তুলে ধরি। গত ৪০ বছরে বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা কমে গিয়েছে ৫ শতাংশ। ১৯৭৪  সালে বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা ছিলো মোট জনসংখ্যার ১৩.৫ শতাংশ। আর সাম্প্রতিক এক জনগননাতে দেখা গিয়েছে বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা হলো ৮ শতাংশের কিছু বেশি। ২০০১ সালের জনগননা অনুযায়ী, বাংলাদেশের হিন্দু জনসংখা ছিল ৯.২ শতাংশ। ধরে নিলাম মুসলিম জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার হিন্দুদের তুলনায় বেশি। এর প্রধান কারণ সার্বিকভাবে মুসলিম জনগোষ্ঠী পরিবার-পরিকল্পনাকে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। তার পরেও হিন্দু জনগোষ্ঠীর হ্রাস পাওয়ার পিছনে নিশ্চয় অন্য কোনো কারণ আছে।  কি সেই কারণ?

২০০১ সালের নির্বাচনের পর কি ঘটেছিল, আশাকরি আপনাদের সবার সেটা মনে আছে। আশাকরি আপনারা ভুলে যাননি পুর্নিমাদের ধর্ষণের কথা! সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি অনৈতিকভাবে দখলের কথা কিংবা সংখ্যালঘুদের পশ্চিমবাংলাতে আশ্রয় নেবার কথা। ঠিক এই ধরনের অত্যাচার সব সময় ঘটেনা। তবুও বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকেই ক্রমাগতভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা প্রধানত হিন্দুরা বাংলাদেশ ছেড়ে অন্য কোনো দেশে, এবং বেশিরভাগই ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। সব খবরে আসেনা, তবুও সারা বছর ধরেই সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি নিয়ম করেই বেদখল হয় (গৌরনদীতে হিন্দু বাড়িতে যুবলীগ নেতার হামলা, কালের কন্ঠ, ২৬ নভেম্বর, ২০১৩ )। ভয় দেখিয়ে হিন্দু কিশোরীকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরবর্তীতে প্রচার করা হয় যে সেই হিন্দু মেয়েটি কোনো মুসলমান যুবককে ভালবেসে মুসলিম হয়েছে। আপনাদের হয়তো মনে আছে সেই ঘটনাটি। একটি এগারো বছর বয়সী মেয়ে শিশুকে জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে ধর্মান্তরিত করার পর তার সাথে কোনো এক মুসলিম যুবকের বিয়ে দেয়া হয়েছে এবং সেই পুরুষটি তাকে প্রায় দুই মাস ধরে আটকে রেখে ধর্ষণ করেছে। (খবর: ধর্মান্তর ও ধর্ষণের শিকার মেধাবী স্কুলছাত্রীকালের কন্ঠ, ২ জুন, ২০১৩)।

ঠিক এরকম ঘটনা যদি এই ২০১৩ সালেও, বাংলাদেশ স্বাধীন হবার ৪২ বছর পরেও ঘটে তাহলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ভীষণ আতঙ্কে ভুগবেন এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে সেইসব পরিবার যেসব পরিবারে কন্যা সন্তান রয়েছে। আমি এক মানবাধিকার কর্মীর কথা জানি যিনি ২০০৪ সালে ফোনে মেয়েকে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে এই হুমকি পাবার পর ৭০ হাজার বাংলাদেশী টাকা দিয়ে ‘রফা’ করেছিলেন আর তার দুই মাসের মধ্যে তার মেয়েকে আমেরিকাতে তার ভাইয়ের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সব সংখ্যালঘুর এই ধরনের সুযোগ সুবিধা থাকে না। আর এরকম সুযোগ সুবিধা থাকলেই যে মৌলবাদী-সন্ত্রাসের ভয়ে ভিত হয়ে এই সুযোগ সুবিধা নিতে হবে এর তো কোনো মানে নেই! যাই হোক, বাংলাদেশে এইধরনের ঘটনায় কোনো  ধরনের আইনি সাহায্য পাবার সম্ভাবনা না থাকায় সংখ্যালঘুদের মধ্যে একধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়। তাদের রক্ষা করার কেউ না থাকায় তারা আপোষ করতে থাকে এবং একদিন আপোষ করার সাথে আর আপোষ করতে না পেরে পালিয়ে যায় নতুন আশ্রয় খোঁজে- ভারতের মাটিতে।

পরের লেখা: নতুন আশ্রয় খোঁজে ভারতের মাটিতে আসার ফলে বাংলাদেশী হিন্দুদের জীবন যাত্রার মানের পরিবর্তন  কি হচ্ছে? এই নিয়মিত ‘দেশান্তর’- ভারত বা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কিভাবে প্রভাব ফেলছে? এই ‘অনুপ্রবেশ’  আগামী ৫০ বছর পরে কোনো রাজনৈতিক সমস্যার কারণ হতে পারে কিনা?

This entry was posted in Activism, Home, Human Rights and tagged , , , , , , , , , , , . Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s