অন্যায়ের প্রতিবাদ চাই..কিন্তু অন্যায়টা নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে বৈকি!

বহুদিন পর এই নোটটা লিখছি ফেসবুকে প্রচারিত একটি ভিডিও ( http://bit.ly/18XAejX ) দেখে। এই ভিডিও তে দেখানো হয়েছে কিভাবে কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা মুর্শিদাবাদের একজন বাঙালি মুসলিম ছাত্র বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন বা হচ্ছেন আজও! যা দেখলাম সেটা কাঙ্খিত নয়। আমিও লজ্জিত কারণ আমাদের সমাজে একটিও অন্যায় ঘটনা ঘটলে সে দায় আমাদেরই নিতে হবে।  আমরা এড়াতে পারিনা এই দায় থেকে। এই ছাত্রটি বিভিন্ন ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন এবং বোঝাতে চেয়েছেন যে সে যেহেতু মুসলিম সেহেতু পশ্চিম বাংলাতে সে এবং তার বন্ধু তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী সুবিধা পাচ্ছেন না।  কথাটা কতটুকু সত্যি সে বিষয়ে বিস্তারিত গবেষনার দাবি রাখে!  কারণ এরকম একটা স্পর্শকাতর বিষয়কে শুধুমাত্র একজন বা দুজন মানুষের অভিজ্ঞতার নিরিখে সরলীকরণ না করাই ভালো।

তবে ছাত্রটি যে ‘বাঙালী’ আর ‘মুসলমান’ – এই দুই এর পার্থক্য শুনেছেন সে পার্থক্য আমারও শোনা! আমি সেটা শুনেছিলাম  মানবাধিকার বিষয় নিয়ে মাস্টার্স পাঠরতা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর মুখে।  আমার বেশ বেগ পেতে হয়েছিল তাকে বোঝাতে যে বাঙ্গালীরাও মুসলমান ধর্মের হয় বা মুসলিমরাও বাঙালী হয়! আমি ধিক্কার জানাই সেই সমাজকে যে সমাজ মানুষকে ধর্ম আর জাত পাতের পরিচয়ে পরিচিত করায়!

সারা ভারতবর্ষেই ভোটের নাম তোষণ চলে।  শুধু গদি আঁকড়ে থাকার লোভে যাকে তাকে — যা ইচ্ছে খুশি দান ধ্যান করা হচ্ছে — আর আমাদের পশ্চিমবাংলা তো দান, ধ্যান, তোষণ ইত্যাদিতে সব রাজ্যের উপরে এখন। আমাদের রাজ্যে মুসলিম ছাত্র ছাত্রীদের বৃত্তি দেবার জন্য টাকা বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু নেবার লোক খুঁজে পাওয়া যায় না! শুনেছি, জানিনা কতটুকু সত্য- আমাদের রাজ্যে নাকি মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের লোকাল ট্রেনে কোনো ভাড়া-ই  লাগে না!

তো এসবের পরেও কি মানতে হবে যে আমাদের পশ্চিম বাংলাতে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো মুসলান ছাত্র- ছাত্রী সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন? পশ্চিমবাংলার হিন্দুরা তুলনামুক ভাবে, আমাদের দেশের অন্য অনেক রাজ্যের হিন্দুদের তুলনায় অনেক বেশি সহনশীল এবং মুক্তমনের। তাই এই প্রেক্ষাপটে এইরকম একটা ভিডিও প্রচার করার কি কোনো যুক্তি আছে?

যাই হোক, এই প্রসঙ্গে আমার আরো কিছু বক্তব্য এবং প্রশ্ন আছে:

১. যিনি এই মুসলিম ভাইটির সাক্ষাত্কার নিলেন তিনি কি যাদবপুর, গড়িয়া, গড়িয়া স্টেশন – দক্ষিন কলকাতার এই সব অঞ্চলে বিভিন্ন মেস বাড়িতে গিয়ে একটু ভালো করে জানবেন কি যে অন্য কোনো মুসলিম ছাত্র থাকে কিনা? থাকলেও কোনো সমস্যার সম্মুখীন হয় কিনা? হলে সমস্যাটা কতটা গভীর? একটা পরিপূর্ণ গবেষণার মধ্য দিয়ে বিষয়টি না করা পর্যন্ত আমি বিষয়টা মানতে চাইছি না। এই গবেষনাতে মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে সাথে অবশ্যই হিন্দু ছাত্র-ছাত্রী এবং হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের বাড়িওয়ালাদের থেকে তথ্য নিতে হবে। আপনাকে পার্ক সর্কাসেও যেতে হবে। সেখানকার মুসলিমদের কাছে জিগ্গেস করতে হবে যে তারা কোনো হিন্দু ছেলেকে ঘর ভাড়া দেবেন কিনা!

২. যিনি সাক্ষাত্কার নিলেন তিনি এই ঘটনাটাকে একটা রাজনৈতিক সমস্যা হিসাবে বর্ণনা করলেন…একদম ঠিক–গভীর পর্যবেক্ষণ। কিন্তু আসল সমস্যাটা মনে হচ্ছে অন্য জায়গায়। যারা জাত-পাত বিচার করেন, যারা ধর্ম বিচার করেন তারা কিন্তু রাজনীতিটা না বুঝেই এটা করে থাকেন। যারা এরকম করেন তারা তো বোঝেনই না যে, তারা যা করছেন সেটার একটা মারাত্মক বাজে রাজনৈতিক দিক আছে বা থাকতে পারে!

৩.  এই মুসলিম ভাইটি মনে করতেই পারে যে তারা বঞ্চিত, তাই একটি আলাদা রাজনৈতিক সংগঠনের দরকার তাদের অধিকার রক্ষা করার জন্য। আমি নিজে নমঃশুদ্র। এই পরিচয়ের জন্য আমি নিজে বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি যার প্রভাব আমার ব্যক্তিজীবনেও পড়েছিলো কম বেশি। কিন্তু আমার জীবিকার উপরে এই প্রভাব পড়েছে বলে মনে হয়নি কখনো। তবে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল থাকার প্রভাব বুঝতে পেরেছি বহুবার। আমি নিজে মনে করিনা শুধু কিছু সংকীর্ণ অধিকার আদায়ের জন্য রাজনৈতিক দল করতে হবে.. বরং মনে হয় সমাজটাকে সত্যিকার অর্থে  বদলাতে একটি নতুন রাজনৈতিক দলের দরকার আছে বৈকি!

সবশেষে, শ্রদ্ধেয় দাদা, কবির সুমন এই ভিডিওটি আপলোড হওয়া ফেসবুক প্রফাইলে একটি কমেন্ট করেছেন। তিনি বলেছেন আমাদের পশ্চিম বাংলার হিন্দুরা, যারা ঢাকাতে কর্মসূত্রে গিয়েছেন, মুসলিম এলাকাতে তাদের ঘর ভাড়া পেতে কোনো সমস্যা হয়নি। যখন কবির দা বাংলাদেশের প্রসঙ্গ টানলেন, তখন খুব জানতে ইচ্ছে করে–  সামগ্রিক ভাবে বাংলাদেশের হিন্দুরা কেমন আছেন? তাদের ধর্মের জন্য তারা কি সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন? না তারা অন্যদের মতই সমান সুবিধা ভোগ করছেন? শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাদের পৈত্রিক ভিটা বেদখল হয়ে যায়নি তো?

আমার এবং আমাদের কথা: আমরা যারা নিজেদেরকে সমাজের অন্য মানুষদের তুলনায়  একটু বেশি  সচেতন বলে মনে করি, তারা খুব স্বাভাবিকভাবেই এই ধরনের  ভিডিওতে ধারনকৃত ঘটনাগুলো দেখে বিচলিত হই….. আমাদের লজ্জা লাগে অন্যসব মানুষের কিছু  অপকর্ম দেখে। কিন্তু যে ঘটনাগুলো লজ্জার সেটা পৃথিবীর সব জায়গাতেই লজ্জার। আজ যে ধরনের কাজকর্ম পশ্চিম বাংলাতে লজ্জার সেটা ওপার বাংলাতেও লজ্জার।  কিন্তু মাঝে মাঝে ভাবি আমরা যারা একটু বেশি সচেতন তারা ওপার বাংলা- এখনকার বাংলাদেশে যখন সংখ্যালঘু এবং নাবালিকা রীতা রানী দাসেরা শুধুমাত্র তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের দুঃস্কৃতি কারীদের হাতে গনধর্ষিতা হয় — আমরা তখনো  কি লজ্জা পাই!

লেখার তারিখ: ১২ অক্টোবর, ২০১৩।

This entry was posted in Home, Human Rights and tagged , , , , . Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s